করোনা পরবর্তী নতুন হ্যাশট্যাগ - PPP এবং দেশীয় কর্মসংস্থান


বিশ্বব্যাপী কর্মহীন মানুষের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। আর করোনা পরবর্তী বিশ্বে নতুন কর্মসংস্হান সৃষ্টি করা হবে এক অন্যতম চ্যালেন্জ। কর্মহীনতার দুশ্চিন্তা আজ এক বৈশ্বিক সংকট। সরকারী বেসরকারী অংশীদারীত্ব বা Public Private Partnership (সংক্ষেপে PPP)-র চৌকস দিকগুলোর একটি হলো দেশীয় কর্মসংস্হান নিশিত করন শর্ত। নতুন কর্মসংস্হান সৃষ্টিতে PPPs রাখতে পারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। যদিও করোনায় ভগ্ন অর্থনীতিতে PPP-র বিনিয়োগ পাওয়া হবে ভিন্ন চ্যালেন্জ, যার সমাধান করতে হবে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ বান্ধব প্রকল্প পরিকল্পনার মাধ্যমে। এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী People-First PPP (Pf PPP) প্রকল্পের বেশ তোড়জোড় শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে, করোনা পরবর্তী নতুন হ্যাশট্যাগ হতে পারে - PPP এবং নিশ্চিত বৃহদাকার দেশীয় কর্মসংস্হান।


আমাদের মত উন্নয়নশীল বাজার অর্থনীতির দেশগুলোতে উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি বড় অংশই থাকে ইন্ফ্রাস্ট্রাকচার বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন। আর এ প্রকল্পগুলোর প্রকল্প ব্যায় থাকে বেশ বড়। সরকারের অর্থনৈতিক এবং কারিগরি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকায় সময় মত পর্যাপ্ত রিসোর্স মোবিলাইজেশন করা যায় না, ফলে তৈরী হয় বড় আকারের অবকাঠামো ঘাটতি। আর এ ক্রিটিক্যাল অবকাঠামো ঘাটতি মিটানোর জন্যই PPP-র সৃষ্টি।


প্রথমে দেখি PPPs কিভাবে কাজ করে। সাধারনভাবে বলতে গেলে সব ভৌত অবকাঠামো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের এখতিয়ার সরকারের। এটাকে একধরনের সরকারি মনোপলি বলা যায়। কোন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান চাইলেই বৃহৎ ভৌত অবকাঠামো যেমন ন্যাশনাল হাইওয়ে, ব্রীজ, পাওয়ার প্ল্যান্ট, এয়ারপোর্ট, কন্টেইনার টার্মিনাল ইত্যাদি তৈরী করতে পারবে না, যদিনা সরকার কোন চুক্তির মাধ্যমে ঐ প্রতিষ্ঠান কে অনুমতি দেয়। দেশীয় অবকাঠামোর উন্নয়নে সরকার প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা এবং বিনিয়োগ সক্ষম বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে PPP চুক্তিতে আসে, যেখানে উভয় পক্ষেরই নির্দিষ্ট কিছু দ্বায়িত্ব এবং অংশগ্রহন থাকে। অর্থাৎ PPP-র মাধ্যমে সরকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারীত্বের চুক্তিবদ্ধ হয়। কোন কোন চুক্তিতে মার্কেট রিস্ক বেসরকারী প্রতিষ্ঠানটির উপর থাকে, কোন চুক্তিতে থাকে সরকারের উপর। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই টেকনলজির দ্বায়িত্ব এবং এ সংক্রান্ত রিস্ক বর্তায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির উপর। সরকার প্রয়োজনীয় অনুমতি এবং নীতিমালা প্রবর্তন বা সংশোধনের দ্বায়িত্ব নেয়, অপরদিকে অর্থনৈতিক বিনোয়োগ এবং বানিজ্যিক ঋন সংস্থানের দ্বায়িত্ব থাকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির উপর। সারকথায় PPP হচ্ছে সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারীত্ব চুক্তি যেখানে দুই পক্ষই বিভিন্ন কাজ এবং রিস্ক শেয়ার করে।


এবার আসা যাক PPPs কিভাবে সরাসরি দেশীয় কর্মসংস্হান তৈরী করে। এর দুটি দিক আছে- নতুন কর্মসংস্হান সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরীতে সহায়তা। এজন্য PPP কন্ট্রাক্ট এ থাকতে পারে দুটি শর্ত যা থাকতে হবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বায়িত্বের মধ্যে। এক - ট্রান্সফার অফ টেকনলজি (সংক্ষেপে টি ও টি), দুই - লোকাল কন্টেন্ট বা দেশীয় পন্য এবং সেবার ব্যাবহার। টি ও টি - র সংক্ষেপিত অর্থ হলো দেশের মধ্যেই উপযুক্ত প্রশিক্ষনের ব্যাবস্থা এবং জনশক্তি তৈরীর মাধ্যমে কারিগরি জ্ঞান হস্তান্তর। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষন ইনষ্টিটিউট ও তৈরী করবে এবং এক্সপেরিয়েন্স শেয়ার করবে। যার ফলে দেশীয় কর্মসংস্হান তৈরীতে শর্ট টার্মের পাশাপাশি লংটার্মেও ভূমিকা থাকবে।


এ শর্তগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য PPP চুক্তিতে এদের স্পষ্ট আর্থিক মান উল্লেখ থাকতে হবে। এর সাথে থাকবে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি সমস্ত প্ল্যান সরকারের কাছ থেকে এপ্রুভ করাবে; সরকার এপ্ল্যানগুলোর বাস্তবায়ন মনিটর করবে। উদাহরণ সরুপ একটি রোড সেক্টর প্রকল্পের প্রকল্প-ব্যায় ১.৪ বিলিয়ন মা. ড. বা আনুমানিক ১২,০০০ কোটি টাকা, যেখানে নির্ধারিত টি ও টি ব্যায় প্রকল্প ব্যায়ের ১% অর্থাৎ ১২০ কোটি টাকা, যা খরচ করতে হবে শুধুমাত্র স্থানীয় জনশক্তি তৈরীতে। এর অধিকাংশই হবে বৃহৎ সিভিল ইজ্ঞিনিয়ারিং বিষয়ক দক্ষ লোকবল, কারন প্রকল্পটি একটি বৃহৎ সিভিল ইজ্ঞিনিয়ারিং প্রকল্প। এ প্রকল্পের ৫০% ক্রয় হবে লোকাল কন্টেন্ট, অর্থাৎ মোট ক্রয়ের অর্ধেক (পন্য এবং সেবা) নেওয়া হবে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। এ খরচের আনুমানিক আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে দক্ষতা ভেদে দিন মজুর থেকে শুরু করে ইন্জিনিয়ার এবং ম্যানেজমেন্ট পজিশনে লোক লাগবে। ফলে যোগ্যতা অনুযায়ী স্থানীয় জনশক্তি এখানে কাজ করতে পারবে, আর জনশক্তি তৈরী এবং দক্ষতা বাড়ানোর জন্য টি ও টি-র ব্যাবস্থাতো থাকছেই। বৃহৎ সিভিল ইজ্ঞিনিয়ারিং প্রকল্পে যেসব কাঁচামাল প্রয়োজন যেমন রেডিমিক্স, সিমেন্ট, রড ইত্যাদি দ্রব্যাদি ও ক্রয় করা হবে স্থানীয় ভাবে। কোয়ালিটি নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন টেস্টিং ল্যাব থেকে সেবা নেওয়া হবে। ট্রাফিক সার্ভেলেন্স সিস্টেম নিয়ে কাজ করতে পারবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। টোল কালেকশনে কাজ করবে স্থানীয় মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস। ফলে এধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ব্যাপক কর্মচান্চল্য আসবে।


এখানে বলে রাখা দরকার, বিদ্যুৎ খাত ছাড়া অন্য সেক্টরের PPPs এ আমরা তেমন কোন সুফল এখনও পাইনি। আমি মনে করি, PPPs এর এসব সুফল নিশিত করার জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে, যেখানে থাকবে সেক্টর স্পেশালিস্ট, PPP এক্সপার্ট, বানিজ্যিক ঋনসংস্থার প্রতিনিধি, লিগ্যাল এক্সপার্ট। এ সেল প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে, নিশ্চিত করবে PPP -র সব চৌকস সুফল।


করোনার এ সময়টায় আমরা আমাদের স্বাস্থ্য খাতের অনেক দুরঅবস্থার কথাই শুনছি। এ কন্সসেপ্টের PPP প্রকল্প (টিওটি এবং লোকাল কন্টেন্ট শর্ত সহ) বেশ দ্রুতই আমাদের স্বাস্থ্যখাতে সুফল দিতে পারে। একই সঙ্গে তৈরী হবে বেশ বড় আকারের দেশীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ। এতে করে আমরা পেতে পারি বিশেষায়িত স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে উপযুক্ত টেকনলজি, প্রশিক্ষিত ডাক্তার, দক্ষ হাসপাতাল কর্মী, আধুনিক ল্যাব, প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট এবং ল্যাব-টেকনিশিয়ান ইত্যাদি। অন্যান্য সেক্টরের PPPs যেমন এয়ারপোর্ট বা আই টি ইত্যাদি ক্ষেত্রেও এ ধারনাগুলো সুফল দিতে পারে।

আমাদের জনসংখ্যার ৬৭.১৪% হচ্ছে ১৫ হতে ৬৪ বছর বয়সের, যার ৪০.৭২% ই হচ্ছে ২৫ হতে ৫৪ বছর বয়সসীমার। বাংলাদেশের নির্ভরতা অনুপাত ( Age dependency ratio) ক্রমাগত কমে এখন চল্লিশের কোঠায়। অতএব কারিগরি ভাবে দক্ষ জনশক্তি এবং বৃহৎ আকারের কর্মসংস্হান সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে আমরা উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে আরো গতিশীল করতে পারি। আর এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর অন্যতম একটি উপায় হতে পারে PPP।


লেখক: মমিনুল ইসলাম, ব্যাংকার এবং পিপিপি বিশ্লেষক

লেখকের সাক্ষাত পেতে ইমেইল করুন: info@tapsd.net

hello@tapsd.net

+8801916364634

  • White LinkedIn Icon
  • White Facebook Icon
  • YouTube

Transnational Advisory Partners for Sustainable Development

Rupayan Prime, Level: B-12, Plot: 2, Dhanmondi, Dhaka-1205, Bangladesh

©2018 proudly created by PenGen Creation